সন্দীপন দাস, বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, সিটি কলেজ
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭-এর (Budget 2026-27) লক্ষ্য কি ২০৪৭? কিন্তু বর্তমানের দিশা কোথায়! এমন এক সময়ে পেশ করা হয়েছে, যখন ভারতীয় অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে সেই স্থিতিশীলতার ছাপ এখনও পড়েনি। বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা, যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং জলবায়ু সংকট—সব মিলিয়ে নীতি-নির্ধারকদের সামনে চ্যালেঞ্জের অভাব নেই। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাজেটটি মূলত একটি বার্তাই দেয়, মোদি সরকার ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে চায়, কিন্তু বর্তমানের সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে আগ্রহী নয়।
Sponsored

অর্থনীতিতে এটি কোনও ‘জনপ্রিয় বাজেট’ নয়; বরং একটি পরিকল্পিত, হিসেবি এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায় নির্মিত নথি। রাজকোষীয় ঘাটতি (Fiscal Deficit) প্রায় ৪.৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে সরকার বোঝাতে চেয়েছে যে তারা আর্থিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও আর্থিক বাজারের কাছে এটি একটি ইতিবাচক সংকেত। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকেই যায়- এই শৃঙ্খলার বোঝা কি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ভোগব্যয় ও জীবনযাত্রার ওপর চাপ বাড়াবে না?
Sponsored

বাজেটের (Budget 2026-27) মূল ভরকেন্দ্র এখনও অবকাঠামো (Infrastructure)। সড়ক, রেল, লজিস্টিকস, নগর পরিকাঠামো- সব ক্ষেত্রেই মূলধনী ব্যয়ের (Capital Expenditure) ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। টিয়ার–২ ও টিয়ার–৩ শহরগুলিকে উন্নয়নের নতুন কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার চিন্তাভাবনাও প্রশংসনীয়। অর্থনৈতিক তত্ত্ব বলে, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। কিন্তু বাস্তবে এর সুফল তখনই মেলে, যখন প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়। নাহলে উন্নয়ন কাগজে থাকে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় কম।
Sponsored

উৎপাদন খাত ও শিল্পনীতির ক্ষেত্রে বাজেট কিছুটা আত্মবিশ্বাসী। সেমিকন্ডাক্টর, বায়োফার্মা, রেয়ার আর্থস—এই সব কৌশলগত খাতে জোর দেওয়া প্রমাণ করে যে সরকার বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এটি কার্যত একটি ‘নতুন প্রজন্মের শিল্পনীতি’। তবে ইতিহাস আমাদের শেখায়, শিল্পনীতির সাফল্য নির্ভর করে তার সময়সীমা, স্বচ্ছতা ও কর্মক্ষমতা নির্ভরতার উপর। নাহলে তা স্থায়ী ভর্তুকি ও অদক্ষতার জন্ম দেয়।
Sponsored

সবচেয়ে বড় নীরবতা লক্ষ্য করা যায় কর্মসংস্থানের প্রশ্নে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, AI ও প্রযুক্তির ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির কথা এসেছে। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হলো—বর্তমানের যুব বেকারত্ব, শিক্ষিত বেকারত্ব এবং নগর অনানুষ্ঠানিক শ্রমের অনিশ্চয়তা। বাজেট এখানে পরোক্ষ পথ বেছে নিয়েছে। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে বলতে হয়, কর্মসংস্থান সমস্যার জন্য শুধু ভবিষ্যতের দক্ষতা নয়, বর্তমানের কাজও দরকার।
Sponsored

স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও তা যথেষ্ট নয়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য বড় করছাড় না থাকায় সরকারের রাজকোষীয় দায়িত্ববোধ বোঝা যায়, কিন্তু এর ফলে চাহিদা বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় বললে, বাজেটটি সরবরাহপক্ষ শক্তিশালী করতে চায়, চাহিদাপক্ষকে নয়।
Sponsored

জলবায়ু ও সবুজ অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাজেট আশাব্যঞ্জক। পরিষ্কার শক্তি ও কার্বন হ্রাসের উদ্যোগ দেখায় যে উন্নয়ন ও পরিবেশকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে না। তবে এই সবুজ রূপান্তর যদি সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে, তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
আরও খবর: বাজেটে ব্রাত্য কৃষক ও যুবসমাজ! মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি শূন্য, তোপ অমিত মিত্রর
সব মিলিয়ে ইউনিয়ন বাজেট ২০২৬–২৭ হল একটি ভবিষ্যতমুখী কিন্তু সংযত বাজেট। এটি বড় কোনো ঝুঁকি নেয়নি, আবার বড় কোনো সামাজিক সাহসও দেখায়নি। অর্থনীতির ছাত্রছাত্রীদের আমি প্রায়ই বলি—এই বাজেট আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্র এখন ‘ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে’ এগোতে চায়। প্রশ্ন হল, এই ধীরগতির উন্নয়ন কি সেই মানুষদের জন্য যথেষ্ট হবে, যারা আজই কাজ, আয় ও নিরাপত্তার অপেক্ষায় আছে? এই প্রশ্নের উত্তর বাজেটের পাতায় নয়, পাওয়া যাবে তার বাস্তবায়নে।
-
-
More from শিরোনাম
View All →
আর জি কর-কাণ্ডে ৩ তদন্তকারী IPS-এর সাসপেনশের মেয়াদ বাড়ল
Jul 6

জঘন্যতম অপরাধে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে: কড়া হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর, মঙ্গলে বারুইপুরে যাচ্ছেন শুভেন্দু
Jul 6

প্রয়াত লোকশিল্পী তীজন বাঈ, শোকপ্রকাশ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর
Jul 5

১৪৭ কেজি ওজনের সোনা-মোড়ানো রামচরিতমানস উধাও! প্রণামী কাণ্ডে নতুন বিতর্কে রামমন্দির
Jul 5

জিআই স্বীকৃতিতে উজ্জ্বল বাংলার তিন ঐতিহ্য
Jul 5







