[caption id="attachment_492704" align="alignnone" width="100"]
উৎপল সিনহা[/caption]
'মহাকাব্যিক স্ট্রিট ফুড', উৎপল সিনহার কলম
Sponsored

" নিন, টপ করে খেয়ে নিন..." টপ করে মুখের মধ্যে চলে তো গেল ছোট্ট গোলাকার বলটি। কিন্তু তারপর ?
Sponsored

তারপরই তো বোঝা যায় সেই বলের কি মহিমা! মানে আজকের ভাষায় ক্যারিশমা! বাসনার সেরা বাসা যে রসনায়, এটা জানে তো সবাই। কিন্তু রসনার সেরা সুখ কিসে ? কার অপেক্ষায় তার দিন কাটে বিরহী রাধাসম ? অবশেষে মহামিলনের লগ্ন এলে প্রথমেই জিভের ডগায় এসে পড়ে ছোট্ট ফুলকো লুচি, যার মাথাটা ফাটা, বুকের ভেতর ঠাসা সেদ্ধ আলু আর মটর, আর গলা অবধি তেঁতুলগোলা জল। আহা, ' মধুর তোমার শেষ যে না পাই... ' ! জিভ আর দাঁতের সম্মিলিত নিপীড়নে চুর্ণবিচুর্ণ অবস্থায় ব্রহ্মতালু ছুঁয়ে খাদ্যনালী বেয়ে ধীরে ধীরে সাক্ষাৎ আনন্দধারা নামতে থাকে রিক্ততার বক্ষ ভেদ করে হৃদয়ের একুল ওকুল দু'কুল ভাসিয়ে। আহা, কী এক আশ্চর্য স্ট্রিট ফুড, কী দারুণ স্বাদ, কী আটখানা আহ্লাদ! অপূর্ব, অপরূপ, অলৌকিক, অপার্থিব, স্বর্গীয়, অনির্বচনীয়! একবার মুখে দিলেই হলো , ক্ষিতি - অপ - তেজ - মরুৎ - ব্যোম একেবারে একাকার হয়ে নাচতে থাকে তাথৈ তাথৈ! ওই ছোট্ট বলের মধ্যেই যেন সমাহিত হয়ে আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড , মুখে দিলেই যেন ' নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু ' ! কী এক প্রকৃত সাম্যবাদী খাবার যে সৃষ্টি করে গেছেন বিদুষী দ্রৌপদী!
Sponsored

হ্যাঁ, মহাভারতের দ্রৌপদী ফুচকার আবিষ্কারক, উদ্ভাবক। জনশ্রুতি অনুসারে, মহাভারতের দ্রৌপদীই প্রথম ফুচকা বা পানিপুরী তৈরি করেন। তখন অবশ্য ফুলকা বা ফুলকি নামে পরিচিত ছিল এই অসামান্য মুখরোচক খাদ্যটি। পাণ্ডবদের বনবাসকালে কুন্তীর দেওয়া সামান্য আটা ও সবজি দিয়ে পঞ্চপান্ডবের ক্ষুধা নিবারণের জন্য দ্রৌপদী তৈরি করেন মুচমুচে স্বাদে ভরপুর এই খাবারটি। সেদ্ধ আলু, ছোলা ও তেঁতুলের জলে ভরা এই খাদ্যের আবিষ্কারক পাণ্ডবদের গৃহবধূ, এটাই পৌরাণিক জনশ্রুতি। তিনিই আটার পুরি তৈরি করে ভেতরে আলু সেদ্ধ, ভেজা ছোলা ও মশলাদার তেঁতুল জল ভরে এই আশ্চর্য খাবারটি পরিবেশন করেন ক্ষুধার্ত পঞ্চপান্ডবের সম্মুখে।
Sponsored

অভিনব উপায়ে তৈরি এই খাবার অল্পেই পেট ভরানোর ক্ষেত্রে অতুলনীয়। অল্প খাবারেই সন্তানদের পরিতৃপ্তি লক্ষ্য করে রীতিমত মুগ্ধ হয়ে যান কুন্তী এবং এই খাবারকে অমরত্বের বর দান করেন বলে কথিত আছে। তবে, একথা বলাই বাহুল্য যে , আট থেকে আশি ফুচকার জন্য অমরত্ব তাচ্ছিল্য করতে রাজি। কথিত আছে, দ্রৌপদীর এই উদ্ভাবনটি ছিল মূলত অভাবকে জয় করার একটি শৈল্পিক প্রচেষ্টা। প্রাচীন ভারতের ষোড়শ মহাজনপদের সময়ে নাকি পানিপুরীর উৎপত্তি হয়েছিল। এর অন্যতম মগধ প্রদেশ , যা এখন পশ্চিম-মধ্য বিহারে অবস্থিত এবং এই স্থানটিই পানিপুরীর জন্মস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। মহারাষ্ট্রে এটি পানিপুরী, উত্তর ভারতে গোলগাপ্পা এবং ওড়িশায় এটি গুপচুপ নামে পরিচিত। আটা বা সুজি দিয়ে তৈরি এই ছোট্ট মুচমুচে, গোল, তেলে ভাজা ফাঁপা পুরীগুলোর ওপরের অংশ ফাটিয়ে মশলাদার সেদ্ধ আলুর ভর্তা দিয়ে ভরে, তারপর মশলাভরা তেঁতুলজলে ডোবানো হয় পরিবেশনের আগে, তাতে কখনও কখনও গন্ধরাজ লেবুর রস মিশিয়ে দেওয়া হয় আরও স্বাদ বাড়ানোর জন্য। মুচমুচে পুরী, নরম নোনতা পুর আর টকঝাল জলের তীব্র ঝাঁঝে একাকার বস্তুটিতে কামড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুখের ভেতরে স্বাদের এক অপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে, যা খাদককে
জগৎ ভুলিয়ে দেয়। মশলা এখানে বারুদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আলুভর্তার মিশ্রণে কুচানো কাঁচালঙ্কা ও তাজা ধনেপাতা স্পিল্টারের কাজ করে। সঙ্গে গরম ঘুগনি মেশানো হয় শুধুমাত্র স্বাদ বাড়ানোর জন্য নয়, প্রথম আঘাতেই কুপোকাত করার জন্য। অবশ্যই মধুর আঘাত। এর জলটা, যা ফুচকার প্রাণ, সবসময়ই টকঝাল ফ্লেভারের হয়, তেঁতুলের সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লেবুর রস মেশানো হয়। যাঁরা ঝাল কম খান, তাঁদের একটু সমস্যা হয় ঠিকই , কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা লোভ সামলাতে না পেরে ঝালের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকেন। অনেকেই এই বস্তুটিকে আদর করে ' নিখুঁত মশলার বোমা ' বলে অভিহিত করেন। মগধ সাম্রাজ্যের সময়কালেও এর নাম ছিল ' ফুলকি ' ।
Sponsored

দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে ফুচকার নানা আধুনিক রূপ এবং নব্য সংস্করণ দেখা যাচ্ছে। দই ফুচকা, ফিশন ফুচকা, এমনকি ভদকা ফুচকাও আজকাল যথেষ্ট জনপ্রিয়। ২০১৫ সালের ১২ জুলাই মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে একটি রেস্তোরাঁ ফুচকার জন্য বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করে। ৫১ ধরনের ভিন্ন স্বাদের ফুচকা বা পানিপুরী তৈরি ও পরিবেশন করে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে এই রেস্তোরাঁটি। সেই দিনটির স্মরণে ২০২৩ সালের ১২ জুলাই ফুচকা নিয়ে বিশেষ ডুডল গেম ( অ্যানিমেটেড গেম) তৈরি করে গুগল। অনেকে বলেন বাংলার ফুচকা লখনউ- এর ' পানি কে বাতাসা ' থেকে একটু অদলবদল করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে পিলি মরিচের বদলে সস্তার কাঁচা লঙ্কা ব্যবহার করে বাজিমাত করা হয়।
Sponsored

আরও পড়ুন- ‘গণতন্ত্রের শত্রু’ বিজেপি! গেরুয়া শিবিরের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠল গণমঞ্চ
_
_
_
_
_












