[caption id="attachment_492704" align="alignnone" width="100"]
উৎপল সিনহা[/caption]
'উপজ চলছে তিকি তাকা', উৎপল সিনহার কলম
Sponsored

রাত গভীর, কিন্তু সারা পৃথিবী জেগে। ২০১০ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল চলছে জোহানেসবার্গে। প্রথমার্ধের খেলা শেষ । গোলশূন্য অবস্থায় বিরতি। স্পেন বল ধরতেই দেয় নি নেদারল্যান্ডসকে। দু'চারবার বল ধরতেই সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিং ফুটবল প্রয়োগ করে কেড়ে নিয়েছে বল। নিজেদের মধ্যে অসংখ্য পাস খেলছে স্পেনের বিখ্যাত ফুটবলাররা। তিকি তাকা তিকি তাকা তিকি তাকা। এ যেন পাসের প্লাবন। অনর্গল, বিরামহীন। এর মধ্যে কখনো কখনো নেদারল্যান্ডস বল ধরলেই দু'তিনজন স্পেনের খেলোয়াড় একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেড়ে নিচ্ছে সেই বল। তারপর আবার সেই তিকি তাকা।
হাফ টাইমে বোধহয় সব বাড়িতেই বসেছে চা অথবা কফির কেটলি। উত্তেজনা তুঙ্গে। কখন আসবে সেই ব্রাক্ষ্ম মুহূর্ত ! কখন হবে সেই পরমাকাঙ্খিত গোল, যার জন্য রাত জাগা!
Sponsored

এমন সময় বেজে ওঠে ফোন। ও প্রান্ত থেকে চেনা চনমনে কণ্ঠে কয়েকটি মাত্র শব্দ। " কেমন দেখছো খেলা ? উপজ চলছে এখন !
চলো, আর মাত্র দু'মিনিট ,
গুড নাইট । "
তারপর খেলা গড়ালো অতিরিক্ত সময়ে। ১১৬ মিনিটে ইনিয়েস্তার একমাত্র গোলে বিশ্বকাপ জিতলো স্পেন। নেদারল্যান্ডসের বারবার ফাইনালে উঠে হেরে যাওয়ার দুর্নাম ' চোকার্স ' এবং ' কুখ্যাত ব্যর্থতা ' এবারও বজায় থাকলো। কিন্তু মোক্ষম সময়ে বর্ধমান নিবাসী বন্ধু কৃতি তবলিয়া বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের বলা ' উপজ চলছে ' উক্তিটি অবিস্মরণীয় হয়ে রইলো। আহা, কি সব সুক্ষ্ম অপূর্ব পাস! উপজ তো অবশ্যই।
Sponsored

এখানে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন ফুটবলে আবার ' উপজ ' আসছে কেন! ' উপজ ' তো মূলত একটি সাঙ্গীতিক পরিভাষা। ভারতীয় রাগ সঙ্গীতে শিল্পীর স্বতঃস্ফূর্ত তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন তথা সৃজনশীলতার অভিনব প্রকাশকেই বলা হয়
' উপজ ' । প্রাচীন বা ব্রজবুলি সাহিত্যে এটি ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে ( যেমন, কত্থক ) এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। পূর্বনির্ধারিত নাচের বোলের বাইরে গিয়ে শিল্পী যখন তাৎক্ষণিকভাবে নিজের ছন্দজ্ঞান, সৃষ্টিশীলতা ও কল্পনার মিশ্রণে নতুন ছন্দ ও ভঙ্গি তৈরি করেন তখন তাকে ' উপজ ' বলা হয়।
Sponsored

ইংরেজিতে improvisation শব্দের খুব কাছাকাছি থাকে ' উপজ ' । শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাৎক্ষণিক স্বতস্ফূর্ততায় সুর ও তানের সৃষ্টিকেও ' উপজ ' বলা হয়। ঠিক তেমনি তিকি তাকা ফুটবলেও প্রতি মুহূর্তে উপজের সম্ভাবনা রয়েছে।
নিজেদের মধ্যে অবিরাম পাস খেলে বল দখলে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে বেদম করে দেওয়াই তিকি তাকা ফুটবলের মূল বৈশিষ্ট্য। নানা ধরনের পাস। পায়ের বিভিন্ন অংশ দিয়ে, বুটের ডগা দিয়ে, গোড়ালি ও চেটো দিয়ে এমনকি শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে পাসিং ফুটবল , যা একাধারে নয়নাভিরাম ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। পাসিং ফুটবল এবং সঙ্গে প্রেসিং ফুটবল, কাঁধ দিয়ে, এমনকি হেড দিয়ে মাটিতে বলটা ড্রপ খাইয়ে দৃষ্টিনন্দন পাসগুলো বারবার উপজের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। ফুটবল তো এমনিতেই ছন্দোময় খেলা। নৃত্যছন্দের সঙ্গে এই খেলার ভীষণ মিল। মনে করুন, জিকো সক্রেটিসদের সেই ব্রাজিলের খেলা। সাম্বা নৃত্য। বল পেয়েই জিকো প্রথমে একটু নেচে নিলো, তারপর দু'তিনজনকে কাটিয়ে বলটা দিলো সক্রেটিসের পায়ে, দুলে উঠলো সক্রেটিসের শরীর, সে-ও একটু নেচে নিলো, তারপর এগোতে লাগলো সাম্বা ছন্দে। এরপর কী করবে সে ? কাউকে পাস দেবে , নাকি ড্রিবল করে এগোবে আরও কিছুটা পথ?
তাতে কি খুলবে প্রতিপক্ষের গোলমুখ ? এই যে রহস্য, এই যে প্রায় প্রতিটি মুহূর্তের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাবন, এই ব্যাপারটাকে আপনি ' উপজ ' ছাড়া আর কী বলবেন ? মনে রাখতে হবে, ২০১০- এর বিশ্বকাপ ফাইনালেই শুধু নয়, সেমিফাইনালেও
জার্মানির মতো শক্তিশালী দলকেও একইভাবে পরাজিত করেছিল স্পেন উপজের যথাযথ প্রয়োগে। মারাদোনা ও মেসির খেলা সবাই দেখেছে। ওদের খেলার পুরোটাই উপজ। অপরূপ নৃত্যছন্দ । আবার একইভাবে, আলি আকবর সাহেবের সরোদ, নিখিল ব্যানার্জীর সেতার, রশিদের গান, জীবনানন্দ দাশের কবিতা বারবার মনে করায় উপজের কথা।
Sponsored

রবীন্দ্রনাথের কথা ও সুরের সমস্তটাই উপজ। নাটকের ক্ষেত্রে অভিনব নাট্য মুহূর্ত সৃষ্টি হলে উপজের কথা আসবেই।
তিকি তাকা ( Tiki-taka ) কৌশলটি কোনো একক ব্যক্তির আবিষ্কার নয়। ডাচ কোচ ইয়োহান ক্রুইফ এবং স্প্যানিশ কোচ পেপ গার্দিওলার হাত ধরে এই দর্শনটির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে। স্প্যানিশ tiquitaca উচ্চারিত হয় ' টিকিটকা ' ।
বিশ্বকাপ জেতার পর থেকে কিন্তু তিকি তাকা ফুটবল থেকে অনেকটাই সরে গেছে স্পেন। তারা নতুন কোনো ফুটবল দর্শনের জন্য অপেক্ষা করছে হয়তো।
Sponsored

আরও পড়ুন- ফ্রান্স সফরে আজ ম্যাক্রোঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রধানমন্ত্রীর, বুধে মোদি-ট্রাম্প বৈঠকের সম্ভাবনা
_
_
_
_
_












